যা অন্ধ নয় তা ভক্তি নয়, অন্ধভক্ত বলে কিছু হয় না





'সা বিদ্যা য়া বিমুক্তয়ে'। ‘মুক্তি’ বলতে ভারতবর্ষ কি বোঝায় পাশ্চাত্যের ভাবধারা দিয়ে তা উপলব্ধি করা কি সম্ভব? রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “য়ুরোপে স্বাধীনতাকে যে স্থান দেয় আমরা মুক্তিকে সেই স্থান দিই। আত্মার স্বাধীনতা ছাড়া অন্য স্বাধীনতার মাহাত্ম্য আমরা মানি না। রিপুর বন্ধনই প্রধান বন্ধন—তাহা ছেদন করিতে পারিলে রাজা-মহারাজার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পদ লাভ করি”। এ কথার অর্থ সম্যক উপলব্ধি করতে ঋষি অরবিন্দের রচনাসমূহ পাঠ করা আবশ্যক। ‘বিমুক্তয়ে’— একটি আধ্যাত্মিক ধারণা। সে সম্বন্ধে সামান্য এক পংক্তি এ লেখার মধ্যেই রইল পরে।

‘বিদ্যা’ শব্দের অর্থই বা কি? ‘বিদ্’ ধাতুর অর্থ কতপ্রকার হতে পারে সংস্কৃত শিক্ষা ব্যতীত তা উপলব্ধি করা কি সম্ভব? ফলে প্রাচীনকালের বক্তব্য ও নীতিবোধ ঠিক কেমন ছিল এবং বর্তমান ভারতবর্ষে তা প্রযোজ্য কি না, ভারত বিদ্যার অধ্যয়ন ও ভারত ভাষার সম্যক জ্ঞান ব্যতীত তা অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। আজকের ভাষা দিয়ে প্রাচীনকালের বক্তব্যকে অনুবাদ করে তাকে পূর্ণ সত্য ধরে নেওয়াও নিরর্থক। তাই প্রাচীনকালের বক্তব্য ও নীতিবোধ নিয়ে বক্তব্য রাখার প্রয়াস হঠকারী ও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

উপরে প্রদত্ত ছবিতে উল্লেখিত লেখায় লেখক বলছেন, “বর্তমানে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হওয়ার পর আমরা প্রত্যেকটি বিষয় যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারার চেষ্টা করতে পারি। আমরা কজন তা করি?” ভারতের মন্দিরগুলি (সৌভাগ্যক্রমে ভারতের সবকটি মন্দির বিদেশীরা ভেঙ্গে শেষ করতে পারে নি) এদেশের প্রাচীন বিজ্ঞান সম্বন্ধে যে সাক্ষ্য দেয় সে সম্পর্কে দু’টি কথা না বলেই যদি আধুনিক বিজ্ঞানের কথায় এসে পড়া হয়, তবে সে বক্তব্যের মধ্যে সততার অভাব স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়। শল্যচিকিৎসার জনক মহর্ষি সুশ্রুতের মূর্তিও যখন এবছরের জুন মাসের ১৯ তারিখে বসল স্কটল্যান্ডের 'দ্য রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস্ অফ এডিনবার্গ'এ, তখন আধুনিক বিজ্ঞানের কথা উত্থাপনের পূর্বে সেইগুলিকে স্মরণ করা অপরিহার্য।

“ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করি, কিন্তু যুক্তি দিয়ে বলুন কজন ধর্ম আচরণের মাধ্যমে উপকার পেয়েছেন?” উঠেছে প্রশ্ন। 

ধর্ম সর্বদাই উপকারী কারণ ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ ন্যায় ও কর্তব্য। অতি বিনীতভাবে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দুইটি শ্লোক। “श्रेयान्स्वधर्मो विगुणः परधर्मात्स्वनुष्ठितात्।स्वभावनियतं कर्म कुर्वन्नाप्नोति किल्बिषम्”।।18.47।। কিংবা, “सहजं कर्म कौन्तेय सदोषमपि न त्यजेत्।सर्वारम्भा हि दोषेण धूमेनाग्निरिवावृताः”।।18.48।।

প্রণামী দান করাকে ‘ধর্ম’ বলে ভাবার মত অর্বাচীনতা বুঝি আর হয় না। প্রণামীর টাকা ঈশ্বরের কাজে লাগুক আর না লাগুক, সরকারের কাজে লাগে। মন্দিরের উপার্জন থেকে সরকার রাজস্ব আদায় করে, উপরন্তু, মন্দিরের টাকা জমা পড়ে ব্যাঙ্কে। ব্যাঙ্কের লোকেরা তা গোনে (গোনার সময় চুরিও করে) এবং মন্দিরের অ্যাকাউন্টে সে টাকা জমা করে। ব্যাঙ্ক তা বাজারে খাটায় যা থেকে কর্মসংস্থান হয় বহু মানুষেরও। অর্থাৎ মন্দিরের প্রণামী সরাসরি দেশের মানুষের কাজে লাগে। যেমন আসামের বন্যাত্রাণে মা কামাখ্যা মন্দির আসামের মুখ্যমন্ত্রীর রিলিফ ফাণ্ডে দিয়েছে ২১ লক্ষ টাকা। উপরন্তু, ঈশ্বরের ইচ্ছা বিনে মন্দিরে প্রণামী পড়া কি সম্ভব? 

অন্যদিকে শোনা যায় একথাও যে প্রতি মুসলিম ব্যক্তিকে প্রতি বছর তার মোট সম্পত্তির দশ শতাংশ নাকি জাকাত হিসেবে দিতে হয় মসজিদকে। আশা করি এ কথা সত্য নয় কারণ এ যদি সত্য হয় তবে এর চাইতে ভয়াবহ এক্সটরশন আর হয় না।

“ঈশ্বর প্রসাদ খান?” প্রশ্নটি যে অর্থহীন তা উপলব্ধি করতে হলে জানতে হবে প্রসাদ শব্দের অর্থ। ‘প্র’ উপসর্গ এবং ‘সদ্’ ধাতু ও ‘অ’ প্রত্যয় যোগে ‘প্রসাদ’ শব্দের অর্থ হল ঈশ্বরকে নিবেদন করার মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রসন্নতা (অর্থাৎ প্রসাদ), কৃপা তথা আশীর্বাদ লাভের প্রয়াস। অতঃপর ঐ খাদ্য গ্রহন করলে যজমান ঈশ্বরের প্রসাদ লাভ করতে পারেন।

তাছাড়া দেবতাকে খাদ্য নিবেদন করলে দেবতা তা গ্রহন করেন এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যেমন চলে না, তেমন দেবতা গ্রহন করেন না, সে বিষয়েই বা নিশ্চিত হওয়া চলে কি করে? আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও যদি দেখা যায়, তবে পিঁপড়ে সন্দেশ খেলে কি বোঝা যায় যে পিঁপড়ে তা থেকে খাদ্য গ্রহন করেছে?

পূজারির দেখভালের দায়িত্ব মন্দিরের ট্রাস্টের। তাঁরা যদি দরিদ্র হন, তবে সে উপায় করা ট্রাস্টের কর্তব্য। উপরন্তু, কালীঘাট মন্দিরের মত মন্দিরে পাণ্ডাদের যে দাপট দেখা যায়, তারপর ‘পূজারীরা গরীব মানুষ’ এমন কথা মানতে কেউ চাইবেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। খড়দহের শ্যামের মন্দিরের পুরোহিত মহাশয় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী খড়দহের বিধায়ক শ্রী অমিত মিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ধরে নিজ পুত্রকে শিক্ষকের চাকরিতে ঢুকিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। অতএব ‘পূজারী গরীব মানুষ’ বলে গণহারে সহানুভূতি আদায়ের প্রয়াস সফল হবে বলে মনে হয় না।

‘ইমাম-মোয়াজ্জিন, ফাদার’দের আর্থিক অবস্থা সম্বন্ধে অবশ্য নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তাঁদের অর্থের জোগান আসে এমনকি বিদেশ থেকেও। রাতারাতি গড়ে ওঠে নতুন নতুন মসজিদ, নতুন নতুন চার্চ। ফলে ইমাম, মোয়াজ্জেম, ফাদার ও পূজারীকে এক গোত্রে ফেলা ভুলই হবে। উপরন্তু, মন্দিরে পুরোহিতের ভূমিকা, মসজিদে ইমাম ও চার্চে ফাদারের ভূমিকাও এক নয়। এ বিষয়ে অধিক ব্যাখ্যায় না গিয়েও বলা যায় যে পূজা  ও অরগানাইজড্ মজহব পালনের বিষয়দ্বয় সম্পূর্ণ পৃথক। দুই’য়ের লক্ষ্য এক হলেও পন্থটি মূলগতভাবে পৃথক।

‘বেশির ভাগ পীর কিংবা বাবা অশিক্ষিত এবং ভন্ড’, একথা যেমন সত্য, তেমন পৃথিবীর প্রধান অর্গানাইজড্ রিলিজিয়নদ্বয়ের ধর্মগুরুদের অধিকাংশও যে একই প্রকার ভণ্ড, সেইটিও অনুরূপ গুরুত্বের সঙ্গে বলা আবশ্যক। মুসলমান সমাজকে নির্বাচনী গাইডলাইন পর্যন্ত দিয়ে থাকেন ইমামরা। কাকে ভোট দিতে হবে, সাধারণ মুসলমান মানুষের কাছে সে নির্দেশ আসে ইমামদের কাছ থেকে। মজহব’এর নামে রাজনীতির এ হেন প্রসার যদি ভণ্ডামি না হয় তো আর কি?

‘কিন্তু ভক্তিরসে আমাদের চোখ এবং মনের দরজা আমরা বন্ধ করে রাখি,’— কথাটি পরস্পরবিরোধিতায় পূর্ণ। ভক্তিরসে মজে থাকেন যাঁরা, তাঁদের মনের দরজা আদতে মুক্ত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান বলছেন, “मय्यावेश्य मनो ये मां नित्ययुक्ता उपासते।श्रद्धया परयोपेतास्ते मे युक्ततमा मताः”॥ অর্থাৎ ভক্তিরসে নিমজ্জিত ব্যক্তিবর্গ আদতে পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত। এ হেন যুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই হয় মুক্তি বা মোক্ষ লাভ। অর্থাৎ “সা বিদ্যা য়া বিমুক্তয়ে” কথার মধ্যে যে বিদ্যা ও মুক্তির কথা উল্লেখিত হয়েছে, সেই প্রকার বিদ্যা ও মুক্তি লাভের অন্যতম এক মার্গ হল ভক্তিমার্গ।

উপরন্তু, ভক্তি মাত্রেই অচল ও অটল। ভক্তিকে ‘অন্ধভক্তি’ বা ভক্তকে ‘অন্ধভক্ত’ বলতে চাইছেন যাঁরা, ‘ভক্তি’ তথা ‘ভক্ত’এর অর্থ বুঝলে হয়ত তা বলতেন না। যিনি ‘ভজনা’ করেন তিনিই ‘ভক্ত’ (ভজ্ ধাতু, ক্ত প্রত্যয়)। ভজনা করতে হলে কি নঞর্থকভাবে ক্রিটিক্যাল হওয়া চলে? যিনি গাল পাড়বেন, তিনি ভজনা করছেন না, অর্থাৎ 'ভক্ত' নন। রামকৃষ্ণ পরমহংস অবশ্য তাঁর আরাধ্য দেবতাকে গাল পাড়তেন। কিন্তু সে গাল পাড়াও আদতে ভজনা। অতএব ‘অন্ধভক্ত’ বা ‘অন্ধভক্তি’ বলে ভক্তিরস তথা ভক্তির মূলভাবকে বিকৃত করার প্রয়াস করছেন যাঁরা, ভারতবর্ষের ইতিহাসে ষষ্ঠ ও সপ্তম শতক থেকে ভক্তি আন্দোলনের যে ঢেউ উঠেছিল দাক্ষিণাত্য থেকে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পাদস্পর্শে ভক্তির যে স্রোতে পুণ্যস্নাত হয়েছিল এই বঙ্গভূমিও, সেই ভক্তিভাবকেই তুচ্ছ করার প্রয়াস তাঁরা করছেন বলে প্রতীয়মান হয়।

‘সবার শেষে বলব, দেবতা যদি থাকে তাহলে মানুষের মধ্যেই আছে,’— লেখকের একথার সঙ্গে সহমত হয়েই বলা আবশ্যক যে ভারতভূমি সেই অনাদি অতীতকাল থেকে শুধু মানুষ নয়, বরং প্রাণী, উদ্ভিদ, আকাশ, বাতাস, নদী, পর্বত আদি সকল জীব ও জড়ের মধ্যে ঈশ্বরদর্শন করে অভ্যস্ত। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে যাঁরা শ্রদ্ধাভক্তি করেন, তাঁদেরকে ‘অন্ধভক্ত’ বা ‘ইডিয়ট’ বলে তুচ্ছ করার প্রবণতাটি বন্ধ হওয়াও একান্ত অনিবার্য। মানুষের মধ্যে ঈশ্বরদর্শন যদি অভিপ্রেত হয়, তবে পিএম মোদীর প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি রাখার বিষয়টি নিয়ে বক্রোক্তি ও ব্যঙ্গোক্তিও সমান অনভিপ্রেত।

Comments

Popular posts from this blog

রথযাত্রা: কুমুদরঞ্জন মল্লিক

অর্থ, কালো টাকা, বিমুদ্রাকরণ

নব্য কথামালা: শেয়াল ও সারসের গল্প

Radical Forces Spreading Tentacles: Bangladesh to West Bengal to Jharkhand