পাখণ্ডী? না পাষণ্ড?

হাওড়ার পাঁচলার সভায় যে বক্তব্য রেখেছিলেন বাগেশ্বর ধাম বাবা, তার স্পষ্টীকরণ তিনি দিয়েছেন স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো’য় অনুষ্ঠিত ‘সনাতন সঙ্গম’ নামক এক সভা থেকে। অনুভূতিবিদ্ধ সাধারণ বাঙালী মানুষের প্রতিক্রিয়াকে সম্বোধন করার মাধ্যমে আচার্য্য ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী মহারাজ বুঝিয়েছেন যে তাঁর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার আদত কারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ। অথচ হাওড়ায় তাঁর বক্তব্য শুনে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় নি যে তিনি ভুল কিছু বলছেন। হনুমান’জী’র এক পরম ভক্ত নিরামিষ ভোজনের কথা প্রচার করবেন এ-ই তো স্বাভাবিক! তাতে ভুল কি ছিল তা বুঝি নি, ফলে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বাবাজী’র কথার বিরুদ্ধে যে ঝড় উঠেছিল তাকেও নিরর্থকই মনে হয়েছিল।


তবে কিনা বঙ্গদেশ শাক্তমতের অনুসারী। মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তির পূজা বঙ্গদেশে চলে আসছে দশম শতাব্দীরও পূর্ব কাল থেকে এমনই মনে করেন পণ্ডিতেরা। অধ্যাপক অশোকনাথ শাস্ত্রীর মতে বাংলাদেশে প্রতিমায় দুর্গাপূজা অন্ততঃ এক সহস্র বৎসরের অধিক প্রাচীন। আবার সেই সঙ্গে এ-ও সত্য যে শাক্ত পূজার নামে নবাবী আমলে বঙ্গদেশে শুরু হয়েছিল চরম অনাচারও যা ঠেকাতে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বঙ্গভূমিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন নিমাই পণ্ডিত তথা শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার এবং তৎপরবর্তী পদাবলী সাহিত্যের উৎপত্তির মাধ্যমে যিনি ঠেকিয়েছিলেন শাক্তপূজার ছুতোয় লোভ ও অনাচারের অধার্মিকতা এবং সেই সুযোগে সুযোগসন্ধানী ইসলামীয়দের তরফ থেকে বঙ্গহিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরকরণের রাজনৈতিক আগ্রাসনকে। সে এক অন্য কাহিনী।


কিন্তু বৈষ্ণবরা নিরামিষাশী এবং মাছ-মাংস ভোজন তথা পশুবলি দিয়ে পূজা সম্পর্কে সহিষ্ণুতা সাধারণ বৈষ্ণবদের মধ্যে একেবারেই নেই যে অসহিষ্ণুতার প্রশংসাও কোনোভাবেই করা চলে না। কিন্তু হনুমান’জী’র ভক্ত হিসেবে যে স্পষ্টীকরণ দেওয়া বাগেশ্বর বাবাজীর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল তা তিনি দিয়েছেন এবং নিজেকে রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ ও বামাক্ষ্যাপা’র শিষ্য হিসেবে দাবী করে বাঙালীর দৈনন্দিন জীবনে মাছ-মাংস ভোজন নিয়ে তাঁর যে কোনো বক্তব্য নেই তা ব্যক্ত করেছেন।


তবে এ হেন স্পষ্টীকরণ আসার পূর্বে আমার একটি ভিডিওর পরিপ্রেক্ষিতে এক্স হ্যাণ্ডলে এক ভদ্রলোক শ্রী অনীক ঘোষ অভিযোগ করেছিলেন (ইংরেজিতে), “দেবযানী, আপনি একটা গোটা ভিডিও বানিয়ে ফেললেন বাগেশ্বর বাবাজী’র প্রতিমার পাশে নন-ভেজ বিক্রি না করার আবেদনের কথাগুলি নিয়ে? কিন্তু বাবাজী যে মাছ মাংস খাওয়া বঙ্গহিন্দুদের  ‘পাখণ্ডী’ বললেন সে নিয়ে তো কিছু বললেন না? এ তো শুধু মণ্ডপে স্টল লাগানোর বিরুদ্ধে বলা নয়! এ তো বাঙালীর দুর্গাপূজা করার পদ্ধতিকেই অশুদ্ধ বলা! আর কত গোবলয়ের দালালি করবেন?  এ রাজ্যে যাঁরা শাক্তপদ্ধতিতে পূজা করেন তাঁদের খাদ্যকে মধ্যপ্রদেশের ঐ ছোঁড়া বলেছে ‘গন্দা’। সে নিয়ে আপনি চুপ?” 


এরকম প্রশ্ন ও অভিযোগ এক্স এবং ফেসবুকে আমার বিরুদ্ধে তুললেন অনেকেই। বললেন আমি নাকি এক নির্লজ্জ দালাল যে মধ্যপ্রদেশের ছোঁড়াটির হয়ে দালালি করছে। কেউ কেউ তো পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যেতেও বললেন।


বঙ্গ সমাজের ঠিক এইপ্রকার মানসিকতার জেরেই বেঙ্গল থেকে ব্রেইন ড্রেইন শুরু হয়েছিল সেই ষাটের দশক থেকে এবং ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে’। তবে কিনা বাঙালী যেখানে বঙ্গদেশের মহাপুরুষ ও মহিয়সী নারীদেরকেও জঘন্য অপমান করতে বাকি রাখে নি, সেখানে আমার মত চুনোপুঁটি এক তুচ্ছ প্রাণীকে তাঁরা যা-ই বলুন, গায়ে মাখলে চলবে কেন? তাছাড়া বাঙালীর যে আচরণ সমালোচনীয়, অন্য রাজ্যের লোক তার সমালোচনা করার পূর্বে একজন বাঙালীই যদি তা করে সারে, তবে বাঙালীরই বরং কিঞ্চিৎ সম্মানরক্ষা বুঝি বা হয়!


ভদ্রলোক আরও বললেন, “রামকৃষ্ণের (রামকৃষ্ণদেব নয়, শুধু রামকৃষ্ণ বলেছেন) বাড়িতে মাছ খাওয়া হয় এবং বিবেকানন্দ (‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নয়,  ভদ্রলোক শুধু ‘বিবেকানন্দ’ বলেছেন)মাংসকে অচ্ছুত মানেন নি। কামাখ্যায় আজও বলি হয়, নেপালের দশেঁই’য়েও বলি হয়, কাশ্মীরী পণ্ডিতরাও দেবীকে দিয়ে থাকেন মাংস ভোগ। এসব করতে বাগেশ্বর ধামের শংসাপত্রের প্রয়োজন তাঁদের কারুরই হয় না। বঙ্গসভ্যতার একটি রীতির অপমানকে পাত্তা না দিয়ে বিষয়টিকে আপনি “হালাল-বিক্রেতা”দের ক্ষতি এবং “সেকুলার বাঙালীরা বিহ্বল হয়ে পড়েছে” বলে বর্ণনা করে বিষয়টিকে ‘ছোট’ করেছেন। একজন বহিরাগত লোক অন্য কারুর ফেস্টিভ্যালে (‘পুজো’ নয়, ভদ্রলোক ‘ফেস্টিভ্যাল’ বলেছেন) ঢুকে এসে তাঁদেরকেই অপমান করেছে আর আপনি তাকে ডিফেণ্ড করছেন। একে ‘বিশ্লেষণ’ বলে না। এর দ্বারা অর্থব্যবস্থার এক ইঞ্চি গ্রোথও হয় না অথচ বাঙালীর অপমানবোধের বৃদ্ধি ঘটে। হয় সেই অপমানের ভারও আপনি বহন করুন নয়ত এই প্রকার ভাণ করা বন্ধ করুন যে বাগেশ্বর বাবাজী’র বলা কথাগুলির মধ্যে কেবলমাত্র ভদ্র কথাগুলিই আপনি শুনতে পেয়েছেন”।


আমার ভিডিও অক্ষরে অক্ষরে শুনে আমাকে এমনভাবে ভর্ৎসনা করার জন্য ভদ্রলোককে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। অধিকাংশ মানুষই যেহেতু হয় নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে অথবা জাজমেন্টাল হয়ে নিজের জ্ঞান জাহির করার জন্য অথবা নিখাদ গালাগালি দেওয়ার মাধ্যমে সমালোচনা করেন, এই ভদ্রলোকের দৃঢ় বিষয়ভিত্তিক সমালোচনাটি সেহেতু প্রকৃতই আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং সুযোগ করে দিয়েছে তাঁর সমালোচনার বিন্দুগুলির উপর যথাযথ নজর দেওয়ার। এর জন্য প্রথমেই তাঁকে জ্ঞাপন করেছি শ্রদ্ধা এবং তারপরেই দিয়েছি বাগেশ্বর বাবাজী’র সেই কথাগুলির ভিডিও যেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের কিছু লোককে ‘পাখণ্ডী’ এবং তাদের খাদ্যকে ‘গন্দা’ বলছেন।


আমার মনে হয়েছে হিন্দি ভাষায় উত্তরভারতীয় টোনে বক্তব্য রাখাও বাগেশ্বর বাবাজী’র কথা বহু বাঙালীর সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারার অন্যতম কারণ। যেমন ধরুন, ‘পাখণ্ডী’ কথাটা বাংলায় (প্রায়) ব্যবহৃতই হয় না। বাংলায় ‘পাখণ্ডী’র নিকটতম সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ ‘পাষণ্ড’ (=পাপিষ্ঠ, অত্যাচারী) যেখানে ‘পাখণ্ডী’ শব্দের অর্থ হল এমন ব্যক্তি যে প্রকাশ্যে নৈতিক উৎকর্ষ, ধর্মবোধ, আদর্শ ও সদগুণের ভাব দেখালেও আড়ালে ও ব্যক্তিগত পরিসরে তঞ্চক, প্রবঞ্চক ও ধর্মবোধহীন লোকঠকানো এক ভণ্ড।


নিম্ন প্রদত্ত একাধিক ভিডিওর (ভিডিও দেখতে খুলতে হবে ফেসবুক লিঙ্ক) https://www.facebook.com/share/r/19MWCEZCBM/ মধ্যে একটিতে স্পষ্ট শোনা যায় যে বাগেশ্বর বাবাজী পূজা মণ্ডপের গায়ে নানা প্রকার আমিষ খাদ্যের ভক্ষণ ও রন্ধনের বিষয়ে (“প্যাণ্ডালকে পিছে অওর তখত কে নীচে ননভেজ কা ভোজন কিয়া জাতা, গন্দে গন্ধে ভোজন বানায়া জাতা”) তাঁর ব্যক্তিগত খারাপ লাগা ও আপত্তি প্রকাশ করছেন। (ভারতের সংবিধানের ১৯ নং ধারা অনুযায়ী আপত্তিপ্রকাশের অধিকার অন্যতম মৌলিক অধিকার)‌। অর্থাৎ তাঁর ব্যক্তিগত আপত্তি মূলতঃ পূজা মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানে (“প্যাণ্ডালকে পিছে অওর তখত কে নীচে”) ফুড স্টল লাগানোর বিষয়েই। ফুড স্টল ছাড়া “গন্দে গন্দে ভোজন” অওর কাঁহা বনায়া জায়েগা? বতাইয়ে?


এ হেন বক্তব্য তাঁর দিক থেকে অনুচিত ও অনৈতিক হয়েছে কিনা, বাঙালী যা খায় তাকে ‘গন্দা গন্দা ভোজন’ বলা উচিত হয়েছে কিনা সে বিচারে যাওয়ার পূর্বে আমাদের বাঙালীদের প্রথমে আত্মসমীক্ষা করতে হবে যে সত্যিই পূজা মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানে ফুড স্টল (ভেজ, নন-ভেজ যা-ই হোক) লাগানো হয় কিনা এবং সত্যই পূজা মণ্ডপের পিছনে রাত্রিবেলা মদ্যপান ও মাংস ভক্ষণের আসর বসে কিনা। পূজা মণ্ডপের একেবারে গা ঘেঁষে রোল কাবাব, চাউমিনের দোকান কি সত্যিই বসে? উত্তর হল— হ্যাঁ বসে, অনেক জায়গাতেই বসে। বাগেশ্বর বাবাজী ঠিকই বলেছেন যে “প্যাণ্ডালকে পিছে অওর তখত কে নীচে” নন- ভেজ ভোজন বানানো হয় ও  খাওয়াও হয়। শুধু ভোজনই নয়, মদ্যাসক্তি মেটাতে রাতভর চলতে থাকে  মদ্যপানও।


এখন প্রশ্ন হল— পূজা মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানে এই ধরনের ফুড স্টল লাগানো, সেখানে হালাল মাংস রান্না করা এবং আপন রসনাতৃপ্তির জন্য পুজোমণ্ডপে বসে সেই খাদ্য গ্রহন করাকে কি শাক্ত প্রথা অনুযায়ী পশুবলির মাংস অথবা মা’য়ের ভোগে দেওয়া মাছ তথা দীর্ঘ উপবাসের পর সেই ভোগকে ‘প্রসাদ’ হিসেবে গ্রহন করার তুলনা আদৌ চলে?


মায়ের পূজা বলি ভিন্ন হয় না। শাস্ত্রপাঠ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান বা সে পাঠের যোগ্যতা  কিঞ্চিৎমাত্র না থাকা সত্ত্বেও নিতান্ত ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের মত মায়ের কাছে বায়না ও ক্ষমা প্রার্থনা করে একটু একটু সে সব পড়ার চেষ্টা মাঝে মাঝে করি। সেরকমই এক শাস্ত্রের ৬৪ নম্বর শ্লোক হল “বলিপ্রিয়া সদাপূজ্যা দৈত্যেন্দ্রমথিনী তথা। মহিষাসুরসংহর্ত্রী কামিনী রক্তদন্তিকা” ॥ ৬৫ নম্বর শ্লোক হল— “রক্তপা রুধিরাক্তাঙ্গী রক্তখর্পরধারিণী। রক্তপ্রিয়া মাংসরুচির্বাসবাসক্তমানসা”॥ 


এসবের সাথে নিজেদের হালাল চিকেন রোল, হালাল মাটন বিরিয়ানি, শিককাবাব আর হালাল চিকেন চাঁপ গলাধঃকরণ করবার তথা সেই সঙ্গে নিজেদের আসক্তি চরিতার্থ করতে পূজামণ্ডপের পিছনে বসে মদ্যপান করে টং হওয়ার সম্পর্ক কি?


উপরন্তু, আমরা কি জানি যে পশুর রক্ত ‘বলিপ্রিয়া’ তথা ‘রক্তপ্রিয়া’ মা’কে উৎসর্গ করার পর উক্ত পশুর মাংস তথা মাছ আর ‘আমিষ’ পদবাচ্য থাকে না? আমার একথা শুনে অবশ্য বাঙালীরা অনেকেই হ্যা হ্যা করে হেসেছে এবং তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্বামী বিবেকানন্দকেও এ হেন বাঙালীরা ‘বিবি কা আনন্দ’ বলে কদর্য ইঙ্গিত করত। রবীন্দ্রনাথকে তো এত যন্ত্রণা এই প্রকার বাঙালীরা দিয়েছিল যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর কলকাতায় যখন আয়োজন করা হয়েছিল তাঁর সম্বর্ধনার, চরম অভিমানে কবি তখন লিখেছিলেন “এ মণিহার আমায় নাহি সাজে”— এসব ভাবলে আজ মনে হয়, এই এত পাপের ভার আমৃত্যু বহন করার পুণ্যটিও তো বাঙালীকেই করতে হবে! এ কর্মের ভার দিয়েই বুঝি বা বিধাতা পাঠিয়েছেন আমাদের? 


এখন প্রশ্ন— মায়ের ভোগে প্রদত্ত মাছ মাংস কেন ‘আমিষ’ নয় বরং ‘নিরামিষ’? এর উত্তর আছে সংস্কৃত ভাষার মধ্যে এবং সরকার গঠনের ঠিক পাঁচ বছর পর ১৯৮২’র নির্বাচনে জেতার পরেই এ রাজ্যে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত যে বাধ্যতামূলক সংস্কৃত ভাষাটি ছিল (মাধ্যমিক পরীক্ষা তখন ছিল ১০০০ নম্বরের, সংস্কৃত ছিল তার অন্যতম ১০০ নম্বরের একটি পেপার) তা তুলে দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার যাতে বাঙালী হয়ে উঠতে পারে সংস্কৃত জ্ঞানহীন ও শাস্ত্রবিচ্ছিন্ন। যতদূর মনে পড়ছে এর সুপারিশ এসেছিল ১৯৮০ সালে গঠিত পবিত্র সরকার শিক্ষা কমিশনের কাছে থেকে।


সংস্কৃত ‘আমিষ’ শব্দের আদত অর্থ নাকি কাঁচা মাংস। উপরন্তু, পড়ে যতটুকু বুঝেছি তা হল— ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অনুযায়ী ‘আমিষ’ সেই বস্তু যার জন্য মানুষ লুব্ধ, লালায়িত হয়। নিজের ভোগের জন্য সংগৃহীত সামগ্রী, অ্যাচিভড্ বাই ট্যাকটিক্স অর বাই ইউসিং বেইট ফর দ্য স্যাটিসফ্যাকশন অফ সেলফ হল আমিষ = অহম+ইষ (ইষ্ প্রত্যয় যার অর্থ ইচ্ছা করা বা আকাঙ্ক্ষা করা)। ফলে মায়ের ভোগ হিসেবে সাত্ত্বিক উপকরণ ও পদ্ধতিতে রন্ধনকৃত মাছ ও মাংস ‘আমিষ’ নয় কারণ তা নিজের রসনাতৃপ্তির জন্য আনাই হয় না। এর পশ্চাতে কোনো প্রাণীকে ঠকানোর প্রবৃত্তি বা প্রলোভন দেখানোর প্রয়াসও নেই। উপরন্তু, বলি দেওয়ার পূর্বে পশুরও পূজা করা হয় বিধিসম্মত উপায়ে এবং তার বলিদানের ফলে তার অর্জিত পুণ্যের কথাও উচ্চারিত হয় মন্ত্রের মাধ্যমে। অর্থাৎ পশুও বলিপ্রদত্ত হওয়ার কারণেই একপ্রকার দেবত্ব প্রাপ্ত হয়। ফলে সেই বলির মাংস বা মাছ ‘আমিষ’ থাকে না। পশুপূজা পদ্ধতির সবিস্তার কালিকাপুরাণে 🙏 আছে, চাইলে যা পড়ে নিতে পারেন যে কেউ।


বর্তমান সময়ে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের কিছু বারোয়ারী পূজা ধার্মিক শাক্তরীতিতে পশুবলি দিয়ে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা শুরু করলে তা সময়োপযোগী ও সমুচিত হবে বলে মনে হয়। এ হেন পূজায় পূর্ব কালের মত ছাগ বলি এবং/অথবা মহিষ বলি হতে পারে যে কার্যে বর্তমান সময়ের লোকেরাও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবেন, ঠিক যেমন বলি দিতে জানা মানুষ পূর্ব কালে প্রত্যেক বাড়িতেই থাকতেন এক বা একাধিক। 


কিন্তু তা বলে পশুবলি এবং মায়ের ভোগের বলির মাংসের প্রসাদ গ্রহন কখনওই পূজা মণ্ডপে মদ অথবা কোল্ড ড্রিঙ্ক সহযোগে রোল, কাবাব খাওয়ার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না।


অন্যদিকে, পৃথিবীতে একজন নির্দিষ্ট উপাস্য ব্যতীত অন্য কোনো কিচ্ছু সত্য নয় এ হেন মন্ত্র পড়ে যে পশুকে আড়াই পোঁচে কেটে মাংস করা হয়, তখন একজন মুসলিম ব্যক্তির জন্য ‌সেই মাংস ‘হালাল’(বৈধ) হলেও যে কোনো অমুসলমানের জন্য তা ‘আমিষ’ তথা ‘নন-ভেজ’ তথা ‘হারাম’(অবৈধ)।‌ মুসলিম ব্যক্তির জন্য এ হেন মাংস বৈধ কারণ তিনি প্রকৃতই বিশ্বাস করেন যে পৃথিবীতে একজন মাত্র নির্দিষ্ট উপাস্য ব্যতীত অন্য কোনো কিচ্ছু সত্য নয়, অন্য কোনো উপাস্যও কোত্থাও নেই এবং সেই একমাত্র নির্দিষ্ট উপাস্যকেই প্রাণীটিকে নিবেদন করা হয়েছে। বস্তুতঃ সেই একমাত্র নির্দিষ্ট উপাস্যকে নিবেদন করার মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে পশুটিকে হত্যা করার  নামই ‘হালাল’ করা যেখানে বহু হিন্দুর ভ্রান্ত ধারণা হল হালাল = আড়াই পোঁচে কাটা। আদতে হালাল = ঐ একমাত্র উপাস্যের মন্ত্রপড়া ও কাটা। মন্ত্রপড়াটিই মুখ্য। তাই এ হেন মাংস মুসলিমরা গ্রহন করতে পারেন। 


কিন্তু যে ব্যক্তি বিশ্বাসই করেন না যে পৃথিবীতে একজন নির্দিষ্ট উপাস্য ব্যতীত অন্য কোনো কিচ্ছু সত্য নয়, যিনি দুর্গাপুজো এবং অন্যান্য আরও নানা দেবতার পূজা মানেন, তিনি যখন ঐ বার্তা বহন করা মৃত প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করেন তখন তাঁর জন্য তা ‘হারাম’ (অবৈধ)। এই প্রকার বিশ্বাসহীনতা সত্ত্বেও ঐ মাংস যাঁরা গ্রহন করেন তাঁরা তা করেন কেবলমাত্র সেই বস্তুর প্রতি প্রলুব্ধ ও লালায়িত হয়েই। অর্থাৎ সে বস্তু অবশ্যই লোভের ধন তথা ‘আমিষ’ এবং মায়ের ভোগের মাছ, মাংসের সঙ্গে তুলনীয় নয়।


অর্থাৎ শাক্তপূজার ভোগের সঙ্গে হালাল মাংস দিয়ে পূজা মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানে বা অন্য যে কোনো স্থানে বানানো চিকেন রোল, এগ রোল, কাবাব, বিরিয়ানি, চাঁপের তুলনা করা যে আদতে চরম পর্যায়ের আত্মঘৃণা ও আত্মাবমাননা সেইটি কি বাঙালীর উপলব্ধিতে নেই? রাত্রে মণ্ডপে বসে এ হেন কু-খাদ্য (বাগেশ্বর বাবাজী’র ভাষায় “গন্দা গন্দা ভোজন”) সহযোগে মদ্যপান করা কি একটি ধার্মিক আচরণ? নাকি আসলে তা সত্যিই ভণ্ডামি বা হিন্দি ভাষায় বললে “পাখণ্ড”? যারা এ হেন আচরণ করে তারা ধার্মিক? নাকি ‘পাখণ্ডী’? বলি এবং মায়ের ভোগে বলির মাংস = ধার্মিকতা। কিন্তু মণ্ডপে মোচ্ছব = পাখণ্ড।


ছোটবেলায় দেখেছি বাড়ির বড়রা খাওয়া শুরু করার পূর্বে পঞ্চ বা অষ্টদেবতাকে উৎসর্গ করে খাওয়া শুরু করতেন। আজ অধিকাংশ মানুষই সে সব আচার পালন করেন না (মূলতঃ সময়াভাবে এবং পরিবারবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে)। কিন্তু যা বিশ্বাস ও আস্থা বহির্ভূত বিষয়, পূজার কালে সে কাজে (অর্থাৎ হালাল মাংস ভক্ষণে) প্রবৃত্ত হওয়া যায় কোন্ যুক্তিতে?


অর্থাৎ প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে সংস্কৃত না জানার ফলে নিজেদের রিলিজিয়ন সম্বন্ধে আমরা অজ্ঞ। আমি সবিনয়ে তা স্বীকার করি। কিন্তু বাগেশ্বর ধামের বাবাজী’র দেবতা  হনুমান’জী। হনুমান’জী’র খাদ্য তো মাছ মাংস নয়! স্বামী জগদীশ্বরানন্দ অনূদিত ও সম্পাদিত ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ অনুসারে‌ “ধর্ম স্বরূপতঃ ধর্মী হইতে অভিন্ন। অগ্নি ও তাহার উত্তাপকে যেমন পৃথক্ করা যায় না, ধর্ম ও ধর্মীকেও তদ্রূপ স্বতন্ত্র করা সম্ভব নহে। এই ধর্মের অপর নাম শক্তি। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেছেন: যেমন জল ও তাহার তরলতা, দুগ্ধ ও তাহার ধবলত্ব, মণি ও তাহার জ্যোতিঃ, সমুদ্র ও তাহার তরঙ্গ অভিন্ন, ব্রহ্ম ও শক্তিও তেমনি অভেদ। যিনি কালী তিনিই ব্রহ্ম। রামপ্রসাদ বলেন, “কালী ব্রহ্ম জেনে মর্ম ধর্মাধর্ম সব ছেড়েছি।”” ফলে সাধারণ খাদ্যাভ্যাস যার যা-ই হোক্ পূজার সময় মাছ মাংস ভোজনকে অকর্তব্য মনে করাই বাগেশ্বর বাবাজীর পক্ষে ‘ধর্ম’ কারণ তিনি হনুমান’জী’র ভক্ত। সুতরাং যদি কেউ বলেন বাগেশ্বর বাবাজীকে গোলবাড়ির কষা মাংস খাওয়াবো, তবে তা প্রতিক্রিয়াশীলতা।


অনীকবাবু এ প্রশ্নও তুলেছেন যে ‘মধ্যপ্রদেশের একজন ধর্মগুরু বাঙালীর দুর্গাপূজাকে অশুদ্ধ বললেন?’ এ প্রসঙ্গে বলা আবশ্যক যে বাঙালীর দুর্গাপূজা ও অন্য যে কোনো রাজ্যের দুর্গাপূজার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই কারণ দুর্গাপূজা হয় ‘শ্রী শ্রী চণ্ডী’ অনুসারে‌। মার্কণ্ডেয় পুরাণের ১৩’টি অধ্যায় হল এই ‘শ্রী শ্রী চণ্ডী’। ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বা ‘দুর্গাসপ্তশতী’ও যতদূর জানি এই অনুসারেই রচিত। তাই দুর্গাপূজা = শ্রী শ্রী চণ্ডী। তাহলে ‘বাঙালীর দুর্গাপূজা’ বলে দুর্গাপূজার কোন্ পৃথকীকরণ করতে চাওয়া হচ্ছে?


শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের গৃহদেবতা ছিলেন রঘুবীর এবং তাঁর গৃহেও মৎস্যভক্ষণ হত। এমনকি পূর্বকালে আমার শ্বশুরবাড়িতেও রঘুনাথ শিলা ও শালগ্রাম শিলা উভয়েই ছিলেন। সে বাড়িতেও মাছ মাংস সবই খাওয়া হত দেবতাকে উৎসর্গ করে। মাংস মানেই বলির মাংস, তা ব্যতীত অন্য যে কোনো মাংস ছিল অগ্রহনীয় “বৃথা মাংস”।


স্বামীজী মাংস খেলেও জেনেশুনে হালাল মাংস নিশ্চিতভাবেই খেতেন না যেখানে হালালের বাণী আর অদ্বৈত বেদান্তের বাণী পরস্পর বিপরীতধর্মী। তাঁর গুরুর সাধনক্ষেত্র মা ভবতারিণীর মন্দিরে বা মন্দির চত্বরেও স্বামী বিবেকানন্দ নিশ্চিতভাবেই মাংস খেতেন না। তাছাড়া শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দকে অন্তরে ধারণ করতে বাঙালী যদি প্রকৃতই পারত, তাহলে “যত মত তত পথ”এর সারবস্তুটিকেও গ্রহন করতে তারা পারত। কেন তবে বাগেশ্বর ধাম বাবাজী’র নিন্দায় এই প্রকার মুখর বাঙালী হল? কেন বুঝতে পারল না যে বাগেশ্বর ধাম বাবা’র মতপন্থটিও একই গন্তব্যের একটি পথ ঠিক যেমন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের পথটি আর একটি? রামকৃষ্ণদেব ও তাঁর প্রধান শিষ্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে এ হেন বাঙালী কি পেরেছে?


দুর্গাপূজার সময় বাঙালীর রাজ্যে আসা কোনো ব্যক্তিকে ‘বহিরাগত’ বলা কবে থেকে বাঙালীর সংস্কৃতি হয়ে গেল? মধ্যপ্রদেশের বাবাজী’র তো বাঙালীর ঘরে আদরণীয় অতিথিনারায়ণ হওয়ার কথা! বেদান্ত শিক্ষার পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণদেব সন্ন্যাস নিয়েছিলেন যাঁর কাছ থেকে সেই তোতাপুরী মহারাজ’জীও জন্মগ্রহন করেছিলেন পঞ্জাবে, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণকে সন্ন্যাস দিয়েছিলেন দক্ষিণেশ্বরের পঞ্চবটীতে! তাঁকেও কি বহিরাগত বলে ধরতে হবে? ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের যুগাচার্য্য স্বামী প্রণবানন্দ’জী মহারাজ সন্ন্যাস নিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষনাথ মন্দিরের স্বামী গোবিন্দানন্দ’জী গিরি মহারাজের কাছ থেকে যে মন্দিরের বর্তমান মহন্ত উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ মহারাজ'জী। স্বামী প্রণবানন্দের গুরুজীও কি তবে ‘বহিরাগত’?


পাখণ্ডীকে ‘পাখণ্ডী’ বললে তা অপ্রিয় শোনালেও এ হেন সত্যের মুখোমুখি বাঙালীকে দাঁড়াতেই হবে। তার জন্য হালাল ইকোনমির যদি অপূরণীয় ক্ষতিও হয় তবে জানতে হবে সে ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী ছিল।

Comments

Popular posts from this blog

রথযাত্রা: কুমুদরঞ্জন মল্লিক

অর্থ, কালো টাকা, বিমুদ্রাকরণ

নব্য কথামালা: শেয়াল ও সারসের গল্প

Radical Forces Spreading Tentacles: Bangladesh to West Bengal to Jharkhand